দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মৃতপ্রায় খাল পুনঃখননের পর বদলে গেছে নওগাঁর গ্রামীণ জনপদের চিত্র। বর্ষায় খালগুলোতে পানি জমায় সেই পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা। কোথাও চলছে মাছ ধরা, কোথাও খালের পানিতে হাঁস পালন। খালের দুই পাড়ে রোপণ করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব গাছ। একই সঙ্গে খাল খননের কাজে স্থানীয় বেকার ও অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
এমন ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি খাল খননে সরকারি অর্থ সাশ্রয়েরও নজির সৃষ্টি করেছে নওগাঁ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। জেলার ১০টি উপজেলার ১৩টি খাল খনন ও পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ করা ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৫৪ হাজার ৩৮৯ টাকা। অব্যয়িত ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় ১৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় না করেই ফেরত দেওয়া হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি প্রকল্পে মোট প্রায় ২৬ কিলোমিটার খাল খনন ও সংস্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে বদলগাছি উপজেলায় দুটি প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি ৪০ লাখ ৭২ হাজার ৬০০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মান্দার দুটি প্রকল্পে ফেরত গেছে মাত্র ৩০ হাজার ৫৩১ টাকা।
নওগাঁ সদর উপজেলার শ্যামপুর মেইন রাস্তা হয়ে হরিপুর দিয়ে কালুপাড়া বিল অভিমুখে এক কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৭১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৯ টাকা বরাদ্দ ছিল। ব্যয় হয়েছে ৫২ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৮ টাকা এবং ফেরত দেওয়া হয়েছে ১৮ লাখ ৬৫ হাজার ১৫১ টাকা। হামড়ার বিল থেকে কৃষ্ণপুর অভিমুখে ২ দশমিক ০৪০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৯০ লাখ ৪২ হাজার ১৫ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৭ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৫ টাকা। অব্যয়িত ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৫০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
রাণীনগরের দেওলা বড়গাছা ব্রিজ থেকে মালশন-গিরিগ্রাম অভিমুখে তিন কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৭২ লাখ ৬০ হাজার ৯৩২ টাকা। ফেরত গেছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯১০ টাকা।
আত্রাইয়ের নওদাপাড়া সিংসাড়া খাল থেকে শুকচারা মাঠ অভিমুখে ১ দশমিক ১৪০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ২৯ লাখ ৩৯ হাজার ৬২৬ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। ফেরত দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬২৬ টাকা।
বদলগাছির চাঁপাইনগর বাছিরের বাড়ি থেকে আধাইপুরের শেষ মাথা পর্যন্ত ৭৫০ মিটার খাল পুনঃখননে ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩৯ লাখ ৮০ হাজার ৬০৫ টাকা। ফেরত গেছে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৯০ টাকা। একই উপজেলার ঢেঁকড়া সফির জমি থেকে খোর্দ্দভূবন ব্রিজ পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার খাল বা ক্যানেল সংস্কারে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৪৮ লাখ ২৯ হাজার ৬৩২ টাকা। ফেরত দেওয়া হয়েছে ২৮ লাখ ৯৯ হাজার ২১০ টাকা।
মহাদেবপুরের নারায়ণপুর ব্রিজ থেকে কুড়াইল গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৫৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৯ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকা। ফেরত গেছে ১২ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৯ টাকা।
মান্দার হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল ব্রিজ থেকে বাদলঘাটা ব্রিজ পর্যন্ত ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫৪ লাখ ১ হাজার ১৫৩ টাকা। ফেরত গেছে মাত্র ১০ হাজার ৩২৭ টাকা। বাঁকাপুর দফাদার মোড় মেইন রোড থেকে বিল উথরাইল পর্যন্ত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৫৪ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৭ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৩ টাকা। ফেরত গেছে ২০ হাজার ২০৪ টাকা।
তবে মান্দার এই দুই প্রকল্পে খাল খননে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো স্থানে দায়সারাভাবে খননকাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে কম টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
পোরশার ইলাম মৌজার মাক্তাপুর মোড় থেকে হাতিখোচা বিল অভিমুখে ৩ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা বরাদ্দ ছিল। ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৮৮ টাকা। ফেরত দেওয়া হয়েছে ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৯ টাকা।
নিয়ামতপুরের বিষ্ণুপুর বাবুল হাজীর জমি থেকে বিষ্ণুপুর ব্রিজ হয়ে সন্তোষপাড়া-ছাতড়া ব্রিজ পর্যন্ত দুই কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৪১৯ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫৪ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৭ টাকা। ফেরত গেছে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬২ টাকা। পত্নীতলার চক আবদাল ইটভাটার কাছ থেকে পত্নীতলা আবেদিয়া স্লুইসগেট অভিমুখে ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার খাল খননে ৫৪ লাখ ৬৮ হাজার ১২৬ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ৫২৬ টাকা। ফেরত দেওয়া হয়েছে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা।
ধামইরহাটের চৌঘাট ব্রিজ থেকে দক্ষিণ দিকে ছিলিমপুর স্লুইসগেট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ২১০ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫৪ লাখ ৩০ টাকা। ফেরত দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ১৮০ টাকা।
রাণীনগরের দেওলা বড়গাছা ব্রিজ এলাকার খালটি দীর্ঘদিন প্রায় মৃত অবস্থায় ছিল। পুনঃখননের পর বর্ষার পানি জমায় এখন খালটি পরিণত হয়েছে কৃষকের পানির উৎসে।
মান্দার হারকিশোর গ্রামের সুমন আলী বলেন, আগে খালটি প্রায় অচল ছিল। পুনঃখননের পর খালে পানি জমেছে। সেই পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে জমিতে চাষাবাদ করা যাচ্ছে। অনেকে মাছ ধরছেন, গৃহিণীরা হাঁস পালন করছেন। খালের পানি গরু-ছাগলেরও কাজে লাগছে। দুই পাড়ে গাছ লাগানোয় ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্যও এটি উপকারী হবে।
সরকারি তথ্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, খালগুলো পুনঃখননের ফলে কৃষিকাজের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন, মাছের আবাসস্থল তৈরি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পোরশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, খাল খনন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্থ শ্রমিকদের মজুরি বা ওয়েজ কস্ট হিসেবে ব্যয় করার কথা। অনেক জায়গায় যন্ত্র দিয়ে কাজ করা হলেও সরকারের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাঁরা শ্রমিকদের দিয়েই কাজ করিয়েছেন।
তিনি বলেন, নকশা ও ডিজাইন অনুযায়ী শতভাগ কাজ শেষ করার পরও কড়া তদারকির কারণে প্রায় ১৩ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও অর্থ সাশ্রয়ের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পর তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল বলেও জানান ইউএনও। সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ হয়েছে বলে জানান তিনি।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানিসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, কৃষির উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, স্ব-স্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে খালগুলোর খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে তা পুনরায় মেরামত করা হয়েছে। খাল পুনঃখননের ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, মাছের বংশবৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং গ্রামীণ ছোট নৌপথ সচল হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নতি হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, জেলার যেসব খাল এখনো মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে খনন বা পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মৃতপ্রায় খাল পুনঃখননের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সরকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
এমএস/